আমরা মানুষঃ এক, অভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্বার অধিকারী-পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী
আমরা মানুষঃ এক,অভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্বার অধিকারী-পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী
-মুহাম্মাদ শেখ রমজান হোসেন
আজকের এই সময়ের এই মুহুর্তে বিশ্বে জনসংখ্যা ৭২০ কোটি ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের মা-বাবা অদ্বিতীয়, এর অর্থ ৭২০ কোটি বনি আদমের সবাই ভাই-বোন, নিগ্রো-ককেশিয়ান এক আদি মায়েরই সন্তান। বিবর্তনবাদের সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে আসছিলেন- মানবজাতির পূর্বপুরুষদের এ ধরাপৃষ্ঠে আবির্ভাব হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে। বিবর্তনের ধারা হিসেবে তার অর্থ দাঁড়ায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সংখ্যা স্বভাবতই হবে অগণিত। বেবুন, গরিলা, শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং এমনি সব প্রজাতির এক ধাপ থেকে অপর ধাপে উত্তরণের মাধ্যমে বিবর্তনের শেষ ধাপ ছিল আমাদের বর্তমান মনুষ্য আকৃতি । কিন্তু মানব ডিএনএ এর সাথে অপরাপর প্রাণীর ডিএনএ-এর ভিন্নতায় এ ধারণা অনেকটা অবৈজ্ঞানিক মর্মে প্রতীয়মান হয়।
ডিএনএ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিম্নরূপঃ
বংশাণুবিজ্ঞান বা জেনেটিকের আলোকে
বংশাণুবিজ্ঞান হল বংশাণু, বংশগতিক বৈশিষ্ট্য এবং এক জীব থেকে আরেক জীবের জন্মগত চারিত্রিক সাযুজ্য ও পার্থক্য সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান। বংশাণুবিজ্ঞানের ইংরেজি পরিভাষা হল "জেনেটিকস", যা বিজ্ঞানী উইলিয়াম বেটসন ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তন করেন।
জীবমাত্রই যে তার পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য আহরণ করে তা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষের জানা এবং নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে তারা শস্য ও গৃহপালিত পশুর মধ্যে কাঙ্ক্ষিত গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছেন। তবে বংশগতির মূলসূত্র অনুসন্ধানে অভীষ্ট আধুনিক বংশাণুবিজ্ঞানের বয়স খুব বেশি নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে অস্ট্রিয়ান ধর্মযাজক গ্রেগর মেন্ডেলের গবেষণার মধ্য দিয়ে এই বিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। [সূত্রঃ Weiling F (১৯৯১)। "Historical study: Johann Gregor Mendel 1822–1884"। American Journal of Medical Genetics। 40 (1): 1–25; discussion 26। ডিওআই:10.1002/ajmg.1320400103। পিএমআইডি 1887835।]
তখনো মানুষ বংশগতির গাঠনিক ভিত্তি সম্বন্ধে খুব বেশি অবহিত ছিল না। তদসত্ত্বেও মেন্ডেল তার পর্যবেক্ষণ থেকে ধারণা করেছিলেন পিতা-মাতা থেকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় বংশগতির কিছু বিচ্ছিন্ন একক দ্বারা, যাদের পরবর্তীতে বংশাণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বংশাণু ডিএনএ'র নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। ডিএনএ হল এমন একটি অণু যা কিনা চারটি ভিন্ন প্রকৃতির নিউক্লিওটাইডে তৈরি, যাদের বিন্যাসই কোনো অর্গানিজমের বংশাণুগত বৈশিষ্ট্যাদি নির্ধারণ করে দেয়। ডিএনএ সাধারণতঃ দ্বি-সর্পিল তন্তুর ন্যায় বিন্যাসিত থাকে ; যেখানে কোন একটি নিউক্লিওটাইড অপর তন্তুতে অবস্থিত নিউক্লিওটাইডের পরিপূরক। প্রতিটি তন্তুই ডিএনএ প্রতিলিপিকরণের সময় তার পরিপূরক তন্তুর জন্যে ছাঁচ হিসাবে কাজ করে, যা কি-না উত্তরাধিকার সূত্রে বংশাণু প্রতিলিপিকরণের ভৌত পদ্ধতি।
বংশাণুর নিউক্লিওটাইডের পরম্পরা অনুযায়ী জীবকোষ অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে দেহসার বা প্রোটিন উৎপন্ন হয় - প্রোটিনে অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম আর বংশাণুতে নিউক্লিওটাইডের ক্রম অভিন্ন রকম হয়ে থাকে। নিউক্লিওটাইডের ক্রম আর অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রমের এই সম্পর্ককে বংশগতীয় সঙ্কেত (জেনেটিক কোড) বলে। প্রোটিনে অবস্থিত অ্যামিনো অ্যাসিড নির্ধারণ করে প্রোটিনের ত্রি-মাত্রিক গঠন কী-রূপ হবে; আর এর গঠন প্রোটিনের কাজ কী হবে তা নির্ধারণ করে। বংশাণুতে অবস্থিত ডিএনএ'র একটি ছোট্ট পরিবর্তন প্রোটিন গঠনকারী অ্যামিনো অ্যাসিডের আকার ও কাজে বড় ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে, যা কিনা ঐ কোষ ও সম্পূর্ণ জীবদেহে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারে (সূত্রঃ https://bn.wikipedia.org/wiki/বংশাণুবিজ্ঞান)।
ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ইংরেজি: DNA) একটি নিউক্লিক এসিড যা জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের জিনগত নির্দেশ ধারণ করে। সকল জীবের ডিএনএ জিনোম থাকে। একটি সম্ভাব্য ব্যতিক্রম হচ্ছে কিছু ভাইরাস গ্রুপ যাদের আরএনএ জিনোম রয়েছে, তবে ভাইরাসকে সাধারণত জীবন্ত প্রাণ হিসেবে ধরা হয় না। কোষে ডিএনএর প্রধান কাজ দীর্ঘকালের জন্য তথ্য সংরক্ষণ। জিনোমকে কখনও নীলনকশার সাথে তুলনা করা হয় কারণ, এতে কোষের বিভিন্ন অংশে যেমন: প্রোটিন ও আরএনএ অণু, গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি থাকে। ডিএনএর যে অংশ এ জিনগত তথ্য বহন করে তাদের বলে জিন, কিন্তু অন্যান্য ডিএনএ ক্রমের গঠনগত তাৎপর্য রয়েছে অথবা তারা জিনগত তথ্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়।
ডিএনএ'র গঠনের অ্যানিমেশন
ইউক্যারিওটিক যেমন প্রাণী ও উদ্ভিদে, ডিএনএ নিউক্লিয়াসের ভিতরে থাকে, তবে প্রোক্যারিওটিক যেমন ব্যাকটেরিয়াতে, ডিএনএ কোষের সাইটোপ্লাজমে থাকে। উৎসেচকের মতো ডিএনএ অধিকাংশ জৈবরসায়ন বিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয় না; মূলত, বিভিন্ন উৎসেচক ডিএনএর উপর কাজ করে এর তথ্য নকল করে রেপ্লিকেশনের মাধ্যমে আরও ডিএনএ তৈরি করে, অথবা অনুলিপি তৈরি ও রূপান্তর ঘটিয়ে একে প্রোটিনে পরিণত করে। ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিন প্রোটিন যেমন হিস্টোন ডিএনএকে ঘনসন্নিবেশিত ও সংগঠিত করে, যা নিউক্লিয়াসের অন্যান্য প্রোটিনের সাথে এর আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অণু সরলভাবে গঠিত একটি লম্বা পলিমার যা পাচঁ কার্বন বিশিষ্ট শর্করা ও অজৈব ফসফেট গ্রুপ দিয়ে গঠিত মেরুদণ্ডের সাথে যুক্ত। এই মেরুদণ্ডে চার ধরনের অণু থাকে যাদের বলে ক্ষার, এই চারটি ক্ষারের ক্রমই তথ্য ধারণ করে। ডিএনএর প্রধান কাজ জিনগত কোড ব্যবহার করে প্রোটিন থেকে অ্যামিনো এসিড এর ক্রম তৈরি করা। জিনগত কোড পড়ার জন্য কোষ নিউক্লিক অ্যাসিড আরএনএতে ডিএনএর কিছু অংশের নকল তৈরি করে। কিছু আরএনএ নকল প্রোটিন জৈবসংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়, বাকিগুলো সরাসরি রাইবোজোম অথবা স্প্লাইসোজোম এর উপাদান হিসেবে থাকে (সূত্রঃ https://bn.wikipedia.org/wiki/ডিএনএ)।
এএফপি, আলজাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃতি দিয়ে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, ১৮ লাখ বছরের পুরনো একটি খুলির ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের পূর্বসূরি আদি প্রজাতি (হোমিনয়েড) আসলে তিনটি নয়, বরং একটিই ছিল। সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ মার্সিয়া পোন্স দো লিয়ঁ বলেন, চোয়ালজুড়ে সম্পূর্ণ করা খুলিটি হচ্ছে ওই যুগের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ করোটি।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে জর্জিয়ার দামিনিসি প্রত্নস্থলে খুবই ভালো অবস্থায় থাকা পাঁচটি হোমিনিড খুলি উদ্ধার করা হয়। এগুলোর একটির সাথে ২০০০ সালে পাওয়া একটি চোয়ালের হাড় ঠিকঠাক মিলে যায়। এতে একটি পরিপূর্ণ খুলি নিয়ে গবেষণার সুযোগ পান বিজ্ঞানীরা। ওই খুলির ধারকের মস্তিষ্কের আকার ছিল আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল নিউজ উইক জানুয়ারি ১১, ১৯৮৮ সংখ্যায় ‘আদম হাওয়ার অনুসন্ধানে’ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
‘পৌরাণিক কাহিনীর বর্ণনাকারীদের উপাখ্যান এখন বিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণার ফলাফলের সাথে একীভূত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই অতীতের এক স্থানে অভিন্ন পূর্বপুরুষের অংশ ভাগ করি।’ এ আবেগময় বক্তব্যটি করেছেন নিউজ উইকে প্রকাশিত নিবন্ধ ‘The Search for Adam and Eve- এর লেখকেরা। লেখকেরা আস্থার সাথে বলেছেন, বর্তমান পৃথিবীতে যত লোক বাস করছে সবাই এসেছে তার থেকে।’
বার্কলের উইলসন ল্যাবে অভিন্ন জাতিসত্বার খোঁজে
মানবজাতির মাতা একজনই
আমাদের এজমালি (অভিন্ন) মাকে খুঁজে বের করার লক্ষ্যে গবেষক রেবেকা ক্যান বার্কলের উইলসন ল্যাবে জীববিজ্ঞানী মার্ক স্টোন কিংয়ের সাথে কাজ করছিলেন। এ লক্ষ্যে রেবেকা ক্যান ১৪৭ জন গর্ভবতী মহিলাকে রাজি করান তাদের গর্ভের ফুল বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে দিয়ে দেয়ার জন্য।
আণবিক জীববিদ্যায় প্রশিক্ষিত এই বিজ্ঞানীরা নিবিড় গবেষণা চালিয়েছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে বিভক্ত বিভিন্ন শ্রেণীর জিনের মাঝে। আর পরীক্ষা করে তাদের মধ্য থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন স্ব স্ব ডিএনএ, যেটা আমাদের একজনমাত্র মহিলার দিকেই নিয়ে যায়, যার কাছ থেকে আমরা সবাই এসেছি। রেবেকা ক্যান বাছাই করেন কিছু আমেরিকান মহিলাকে-যাদের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে। নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়ায় তার সহযোগী হিসেবে যারা কাজ করছিলেন তারা খুঁজে পেলেন সেখানকার আদিবাসীদের। শিশুরা জন্ম নিল, গর্ভের ফুল সংগ্রহ করে হিমায়িত করা হলো এবং বার্কের উইলসন ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হলো। ব্লেন্ডারের সাহায্যে টিস্যুগুলো পরিণত করা হলো স্যুপে। সেন্ট্রিফিউজ কোষ বিভাজন ডিটারজেন্টের সাথে মেশানো হলো, স্ফুর জ্যোতির্ময় দিয়ে শুকিয়ে আবারো সেন্ট্রিফিউজ করা হলো। ফলে পাওয়া গেল স্বচ্ছ তরল পদার্থ, যেটা ছিল ডিএনএ’র খাঁটি উপাদানে তৈরি। বিস্ময়কর ব্যাপার যেটা নজরে পড়ল, তা হচ্ছে- এই ডিএনএ সেই ডিএনএ নয়, যা শিশুর দেহকোষের নিউক্লিয়াসে এবং শিশুর দৈহিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে থাকে। এটি উত্তরাধিকার সূত্রে আসে কেবল মা থেকে। বার্কলের গবেষকরা প্রতিটি ডিএনএ নমুনাকে টুকরো টুকরো করে কর্তন করলেন, যাতে এগুলোকে অপর সব শিশুর ডিএনএন’র সাথে তুলনা করা সম্ভব হতে পারে। যে ফল পাওয়া গেল, তাতে দেখা যায় বিভিন্ন জাতির মধ্যকার পার্থক্যটা বিস্ময়কররূপে অতি সামান্য। স্টোন কিং বলেন, ‘বিভিন্ন জাতির মধ্যে জেনেটিক পার্থক্যটা বাস্তবিকই খুব কম হয়ে থাকে।’
নিউগিনিদের ডিএনএ-তে দেখা গেল তাদের ডিএনএ অপরাপর নিউগিনিদের চেয়ে বরং আর সব এশিয়ানদের অনেক বেশি কাছের। এটা অদ্ভুত মনে হতে পারে জাতি অথবা বংশগত বাস্তব পার্থক্যসত্ত্বেও। বাস্তবে দেখা যায়, জাতিগত অনেক পার্থক্যই মূলত গতানুগতিক, নিতান্ত সাধারণ।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানুষের ত্বকের রঙ কালো হয়ে থাকে আবহাওয়ার সাথে বড় ধরনের সামঞ্জস্যতা রেখে। আফ্রিকানদের কালো রঙ সূর্যের রশ্মি প্রতিরোধের জন্য হয়ে থাকে। তেমনি ইউরোপিয়ানদের গায়ের রঙ সাদা হওয়ার কারণ হচ্ছে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি শোষণ- যেটা ভিটামিন ‘ডি’ তৈরিতে সাহায্য করে। ত্বকের রঙের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হয় কয়েক হাজার বছর। পক্ষান্তরে শত শত হাজার বছরের দরকার পড়ে ব্রেইন সাইজের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে। প্রতিটি শিশুর ডিএনএ গঠন শেষ পর্যন্ত মিলে যায় একজন মাত্র মহিলার সাথে। জেনেটিক উত্তরাধিকার এমন একটি বিষয়, যেটা এমনকি পরিসংখ্যানবিদদের কাছেও তেমন বিস্ময়কর কিছু নয়।
অবশ্যই জগতজুড়ে একজন ভাগ্যবতী মা-ই ছিলেন
উইলসন ল্যাবের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘অবশ্যই একজন ভাগ্যবতী মা ছিলেন।’ ইলোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডগলাস অলেস পরিচালিত গবেষণায় একদল প্রজনন বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন যোগসূত্র থেকে ধারণা করেন, দুনিয়ার প্রথম এই মহিলার আবির্ভাব হয়ে থাকবে এশিয়া মহাদেশে। বিশ্বের চারটি মহাদেশে ৭০০ মানুষের রক্ত থেকে সংগৃহীত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ’র ওপর ভিত্তি করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। ‘ডিএনএ’ টুকরো টুকরো করে খণ্ডিত করার জন্য তারা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং সেগুলোকে বংশতালিকায় সাজান। এই তালিকা পরিশেষে অতীতের একজন মহিলার কাছে গিয়ে থেমে যায় যিনি দেড় থেকে দুই লাখ বছর আগে এই ধরাপৃষ্ঠে বাস করতেন, তাদের হিসেবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরর জীবাশ্ম বিজ্ঞানী স্টেফন জে গোল্ডের মতে, ‘এটা আমাদের এই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করে যে, বিশ্বের সব মানুষ তাদের বাহ্যিক ও আকৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও একটিমাত্র সত্তা থেকে এসেছে এবং মানব বংশের উৎপত্তি খুব কাছের একটিমাত্র জায়গায়। সব মানুষের মধ্যে জীবতাত্ত্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ অনেক বেশি গভীর, যার ধারণা আগে কখনো ছিল না।
মানবজাতির পিতা একজনই
দৈনিক বাল্টিমোর সান পত্রিকা Geneticists Reveal Human Family Trees শিরোনামে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, মানবদেহের জীবকোষে যে ‘Y’ ক্রোমোজম রয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এমন সঙ্কেত পাওয়া যায় যে, গোটা মানবজাতির আদি পিতা মাত্র একজনই। গবেষণার এই রিপোর্টটি উদ্ঘাটন করেছে, আজকের প্রত্যেকটি পুরুষ যে ‘Y’ ক্রোমোজম ধারণ করছে, তার লক্ষণ থেকে এটা স্পষ্ট, এটি এসেছে একজন মাত্র পুরুষের কাছ থেকেই।
এ নতুন গবেষণার ফলাফল এ ধারণাটাই সমর্থন করে, আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল পৃথিবীর মাত্র একটি স্থানেই। যদিও পুরনো ধারণা হচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের একাধিক স্থানে মানবজাতির পূর্বপুরুষদের উদ্ভব ঘটেছিল। অআধুনিক বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত ধারণা হচ্ছে, এক স্থান থেকেই মানব জাতির উদ্ভব এবং সম্ভাব্য স্থানটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য তথা আফ্রিকা।
উল্লেখ্য, ডারউইনের ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ অনুসারে অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়ে থাকবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে। ‘Y’ ক্রোমোজম হচ্ছে মানব বংশানুগতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক উপাদান ‘জিন’, যে ২৪ ধরনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সুতা দিয়ে গঠিত যা পিতার শুক্রকীটের মাধ্যমে প্রথমে মাতৃগর্ভে এবং পরে মাতৃগর্ভ থেকে সন্তানের (ছেলে-মেয়ের) দেহে নিহিত ডিএনএ-তে সঞ্চারিত হয়। গবেষক মি. হেমার ‘Y’ ক্রোমোজমের অতি ক্ষুদ্র অংশের গঠনের বিশদ তুলনা করেন। সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে লালিত আটজন আফ্রিকান, দু’জন অস্ট্রেলিয়ান, তিনজন জাপানি এবং দু’জন ইউরোপীয়দের কাছ থেকে। গবেষকদের মনে যে ধারণাটি কাজ করছিল তা হলো- বিভিন্ন জাতির মধ্যে ক্রোমোজমের সামগ্রিক বিন্যাসের রকমফের কেমন ভিন্নরূপ গ্রহণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করা। নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে যে ফল পাওয়া গেল, তাতে দেখা যায়, যত মানবসন্তান আজকের দুনিয়ায় বাস করেছে, করছে, তাদের সবারই ‘Y’ ক্রোমোজমের যোগসূত্র মেলে কেবলমাত্র একজন পুরুষের সাথেই।
তথ্য সূত্রঃ ১.https://bn.wikipedia.org/wiki/ডিএনএ ২.https://bn.wikipedia.org/wiki/বংশাণুবিজ্ঞান
৩. মানুষ এক আদিমাতার সন্তানঃ মুহাম্মাদ আলী রেজা, সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
https://www.alkawsar.com/bn/article/1229/
Comments
Post a Comment